চালের রাজাধানী খাজানগর

অনলাইন ডেস্ক: কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বটতৈল মোড় থেকে ডানে গেছে আলমডাঙ্গা সড়ক। এই সড়ক ধরে কয়েক কিলোমিটার ভেতরে গেলেই চোখে পড়বে চালকল ও চাতাল। একটি-দুটি নয়; যেদিকে চোখ যায় শুধুই চালকল। যেখানে দল বেঁধে কাজ করছেন নারী-পুরুষেরা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এমন কর্মমুখর থাকে খাজানগর নামের এই এলাকা।

কুষ্টিয়া শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পরেই এর অবস্থান। চাল উৎপাদনের জন্য এখন খাজানগর সারা দেশে পরিচিত। বিশেষ করে সরু (মিনিকেট) চালের জন্য খাজানগরের রয়েছে আলাদা নামডাক। দেশে চালের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ এই মোকাম থেকে পূরণ হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিন এ মোকাম থেকে শতাধিক ট্রাক চাল যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি আছে নানা সংকটও। এসব সংকট উত্তরণ করা সম্ভব হলে চাল শিল্পে বিপ্লব ঘটবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মিলমালিকেরা জানান, ১৯৭৮ সালে প্রথম খাজানগরে চালকল ও চাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় কুমিল্লা থেকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কবুরহাট মৌজায় এসে চালকল ও চাতাল ব্যবসার গোড়াপত্তন করেন দাদা রমিজ প্রধান নামের এক ব্যক্তি। তিনি জমি কিনে ছোট পরিসরে হাসকিং মিল স্থাপন করে ব্যবসা শুরু করেন। একে একে গড়ে উঠতে থাকে চালকল ও চাতাল। খাজানগর এলাকায় সেই সময় বিদ্যুৎ ছিল না। দাদা রমিজ প্রধান নিজের অর্থে পার্শ্ববর্তী আলমডাঙ্গা ফিডার থেকে ১৮টি খুঁটির সাহায্যে খাজানগরে বিদ্যুৎ নিয়ে আসেন। কর্মমুখর হয়ে উঠতে শুরু করে এলাকাটি। বর্তমানে তাঁর ছেলে আবদুস সালাম প্রধান ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁদের দুটি অটো মিল রয়েছে। বিভিন্ন ব্যান্ডের চাল উৎপাদন করেন তাঁরা।

খাজানগর এলাকার চাল উৎপাদনে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রশিদ অ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্টের মালিক ও বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, খাজানগর দেশের অন্যতম একটি সম্ভাবনাময় চাল শিল্প এলাকা। দেশের চাহিদার ৩০ শতাংশ জোগান যাচ্ছে খাজানগর থেকে। মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণার দাবি করে আসছেন। চাল ও ধানের সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা তৈরি হলে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই ঠকবেন না। নতুন যাঁরা স্বয়ংক্রিয় চালকল স্থাপন করতে চান, তাঁদের বিনা সুদে লোন দেওয়া হলে খুবই ভালো হয়।

জেলা খাদ্য অফিস সূত্র জানায়, খাজানগরসহ আশপাশের এলাকায় বর্তমানে ৪২টি অটো (স্বয়ংক্রিয়) রাইস মিল আছে। আর হাসকিং (ম্যানুয়াল) মিল আছে চার শতাধিক। তবে অনেক হাসকিং মিলে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া অটো মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরেও অনেক মিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

চালকলমালিকেরা জানান, প্রতিদিন খাজানগর চাল মোকামে যে চাল প্রস্তুত করা হচ্ছে, সেই ধানের বড় একটি অংশ আসে যশোর ও নওগাঁ থেকে। প্রতিদিন এ মোকামে ৪ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়। ভোর থেকে মিলগেটে চালের কেনাবেচা শুরু। সকাল ১০টার মধ্যে কেনাবেচা শেষ হয়ে যায়। খাজানগরে যেসব চাল উৎপাদন হয়, তার মধ্যে আছে মিনিকেট, আটাশ, কাজললতা ও গুটি স্বর্ণা। এসব চালের মধ্যে সব থেকে উৎকৃষ্ট মিনিকেট। বিশেষ করে রশিদ মিনিকেট, দাদা রাইস মিনিকেট, বিশ্বাস মিনিকেট ও স্বর্ণা মিনিকেট নামকরা।

দাদা রাইস মিলের অন্যতম কর্ণধার ও জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে প্রতিদিন গড়ে ২০০ ট্রাক চাল সারা দেশে যায়। যার বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। এ ছাড়া খুদ, গুঁড়া, পালিসসহ অন্যান্য অংশ মিলিয়ে প্রতিদিন খাজানগর মোকামে ২০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। তাই এলাকায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শাখাও রয়েছে।

চালকল মালিকেরা জানান, চালকল ও চাতালের সঙ্গে শ্রমিকেরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে ৫ হাজার নারী-পুরুষ এখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এর বাইরে চালসহ খুদ, গুঁড়া, মাছি ও পালিস ব্যবসায় সব মিলিয়ে ১৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান খাজানগরে।

খাজানগরের অনেকে হাসকিং মিল থেকে একাধিক অটো মিলের মালিক বনে গেছেন। পরিশ্রম ও সততা দিয়ে ব্যবসা করে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সুবর্ণা অটো রাইস মিলের মালিক জিন্নাহ আলম অন্যতম। তিনি বলেন, খুব ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তখন পুঁজি ছিল সামান্য। সেই থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। হাসকিং মিল স্থাপন করেন। এরপর ব্যবসা ভালো হওয়ায় ব্যাংক লোন নিয়ে অটো মিল স্থাপন করেন। বর্তমানে ব্যবসা ভালো হচ্ছে।

অটো চালকল মালিকেরা জানান, দিন দিন সব আধুনিক হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় চালকল স্থাপন বাড়লেও এর যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য দেশে দক্ষ জনবল নেই। যারা আছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। তাই চালকলের বয়লার, পাওয়ার ও বয়লিংয়ের জন্য কুষ্টিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও বিভিন্ন টিটিসিতে যেসব কোর্স চালু আছে, তার সঙ্গে এই বিষয়েও কোর্স চালু করা প্রয়োজন। তাহলে এখানে দক্ষ শ্রমিক তৈরি হবে। দুর্ঘটনাও কমে আসবে।

চালকল মালিক সমিতির সভাপতি ও স্বর্ণা অটো রাইস মিলের মালিক আবদুস সামাদ বলেন, দেশে বিপুল পরিমাণ সরু চাল উৎপাদিত হচ্ছে। সরকারিভাবে এ চাল দেশের বাইরে পাঠানো গেলে বিদেশি অর্থ আয় করা সম্ভব। এই খাতে শত শত কোটি টাকা এখন বিনিয়োগ হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। তাই এটাকে শিল্প ঘোষণা করে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। সূত্র:প্রথম আলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.