‘কোন দেশে কত বাড়ল আক্রান্ত লকডাউন শিথিলের পর’

অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে প্রলয় সৃষ্টি করেছে আণুবীক্ষণিক জীব নভেল করোনাভাইরাস। এরই মধ্যে ভাইরাসের বিষাক্ত ছোবলে বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ। মারণ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন চলছে দেশে দেশে। তবে ভেঙে পড়েছে অর্থনীতির সবগুলো সেক্টর। অর্থনীতি বাঁচাতে অনেক দেশ লকডাউন শিথিলের পথে হাঁটছে। এই প্রক্রিয়াকে বিপজ্জনক বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। লকডাউন শিথিল হলে ফের করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকদের একাংশ।

তবে চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করতে লকডাউনের ঢাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছে আমেরিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশ। সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও লকডাউন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। বাংলাদেশ ও ভারতও সংক্রমণের গতি উপেক্ষা করে লকডাউনের কড়াকড়ি শিথিল করেছে।

লকডাউন শুরু হওয়ার আগে কোন দেশে করোনা সংক্রমণ কোথায় দাঁড়িয়েছিল, বর্তমানে তা কোথায় রয়েছে, দেখে নেওয়া যাক এক নজরে।

গত বছর নভেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম হানা দেয় নভেল করোনাভাইরাস। সংক্রমণের হার আর মৃতের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে দেখে তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে চীন সরকার। ২৩ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় লকডাউন। প্রায় আড়াই মাস পর ওঠে লকডাউন। তত দিনে অবশ্য করোনা সংক্রমণে অনেকটাই লাগাম পরিয়ে ফেলেছে চীন। কিন্তু লকডাউন ওঠার পর ফের সংক্রমণ চিন্তায় রেখেছে প্রশাসনকে।

চীন থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। আমেরিকায় তীব্র গতিতে বাড়তে থাকে সংক্রমণ। ১৬ মার্চ লকডাউন শুরু হয় আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে। কিন্তু লকডাউন তোলার জন্য শুরু হয় বিক্ষোভও। বিভিন্ন রাজ্যে লকডাউন শিথিল হলেও সংক্রমণ বাড়ছে আমেরিকায়। সেইসঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। আমেরিকায় এখন করোনায় আক্রান্ত ১৩ লাখের বেশি। মৃতের সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হবে আমেরিকায়। তবে লকডাউন তুলে নিতে মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন। সে সিদ্ধান্ত যে হিতে বিপরীত হচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যার বৃদ্ধি থেকেই তা বোঝা যায়।

ইউরোপে করোনার অন্যতম ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে ইতালি। সেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে সংক্রমণ। হাসপাতাল ভরে যায় করোনা আক্রান্ত রোগীতে। সংক্রমণের হার দেখে ৯ মার্চ লকডাউন ঘোষণা করে ইতালির সরকার। পরে সংক্রমণে কিছুটা লাগাম পরায়, ৪ মে থেকে লকডাউন শিথিলের ঘোষণা করা হয়। করোনার হানায় এখনো পর্যন্ত ইতালিতে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইউরোপের এই দেশেও কিন্তু লকডাউন তোলার পর সংক্রমণ বেড়েছে।

করোনা হানা দেয় স্পেনেও। অবস্থা বেগতিক দেখে লকডাউনের পথে হাঁটে স্পেন সরকারও। ২৮ এপ্রিল থেকে দেশে ধাপে ধাপে লকডাউন শিথিলের ঘোষণা করেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী। লকডাউন তোলার পরেও কিন্তু স্পেনে সে ভাবে বাড়েনি আক্রান্তের সংখ্যা। স্পেনে মোট করোনা আক্রান্ত ২ লাখের বেশি। মৃত্যু হয়েছে ২৬ হাজারের বেশি মানুষের।

করোনার ছোবল থেকে বাঁচতে লকডাউনের পথে হাঁটে ব্রিটেনও। অন্যান্য অনেক দেশ লকডাউন তুললেও, সে সময়ে এ নিয়ে পদক্ষেপ করেনি বরিস জনসনের দেশ। ৮ মে লকডাউন শিথিলের ঘোষণা করা হয় দেশে। ব্রিটেনে এখনো পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যু হয়েছে ৩৩ হাজার মানুষের।

করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ১৪ মার্চ লকডাউন শুরু হয় ফ্রান্সে। সে সময় আক্রান্তের সংখ্যা কম ছিল। টানা লকডাউনের পর, ২৮ এপ্রিল তা শিথিলের ঘোষণা করা হয়। ফ্রান্সে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন দেড় লাখেরও বেশি মানুষ। মৃত্যু হয়েছে ২৬ হাজার মানুষের। লকডাউন তোলায় দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।

করোনা সংক্রমণ রুখতে জার্মানিতে লকডাউন শুরু হয় ২০ মার্চ। তার পর থেকে টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে লকডাউন। এর মধ্যেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে লকডাউন শিথিল করা হয়। যদিও লকডাউন শিথিল করা নিয়ে রাজ্যগুলিকেই সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল। লকডাউন শিথিল হওয়ার পর থেকে জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা মারাত্মক ভাবে বাড়েনি। এখনো পর্যন্ত জার্মানিতে করোনা আক্রান্ত এক লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যু হয়েছে সাড়ে সাত হাজার জনের।

গত ২৫ মার্চ থেকে লকডাউন শুরু হয়েছে ভারতে। প্রথম ও দ্বিতীয় পেরিয়ে এখন তৃতীয় দফায় পড়েছে লকডাউনের মেয়াদ। যদিও এর মধ্যেই দেশের গ্রিন জোন হিসাবে চিহ্নিত করা এলাকাগুলিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। লকডাউন যে তৃতীয় দফা পেরিয়ে চতুর্থ দফাতেও গড়াবে তা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা চীনের ঠিক পরেই। ৭৮ হাজার মানুষ এখনো পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত। মৃত্যু হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের। লকডাউন শিথিল করলে আক্রান্তের সংখ্যায় তার কতটা প্রভাব পড়ে সেটাই দেখার।সূত্র- আনন্দবাজার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *