ইসলাম কি বলে , সন্দেহবশত কাউকে আঘাত করার ব্যপারে !

ন্যাশনাল ডেস্ক : ছেলেধরা আতঙ্কে অস্থির দেশ। সাধারণত দেশে কোনো বড় সরকারি ব্রিজ, কালভার্ট ইত্যাদির কাজ শুরু হলেই এমন কথা শোনা যায়। এটা হতে পারে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্ত। রাসুল (সা.) চৌদ্দ শ বছর আগেই এ ধরনের অলীক বার্তায় কান দিতে নিষেধ করে গেছেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শেষ যুগে কিছুসংখ্যক মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। তারা তোমাদের কাছে এমন সব অলীক কথাবার্তা উপস্থিত করবে, যা না তোমরা শুনেছ, না তোমাদের বাপ-দাদা শুনেছে। সাবধান! তোমরা তাদের থেকে বেঁচে থাকো এবং তাদের তোমাদের থেকে বাঁচাও। অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকো, যাতে তোমাদের পথভ্রষ্ট করতে না পারে এবং তোমাদের বিপথগামী করতে না পারে।’ (মুসলিম, মিশকাত, হাদিস : ১৫৪)

জাহেলি যুগেই শয়তানের উদ্দেশে এ ধরনের মানুষ বলি দেওয়া হতো। শরিয়তে এ ধরনের কাজের কোনো ভিত্তি নেই। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে অবিশ্বাসীদের উদ্ভট চিন্তাধারার সমালোচনা করে বলেন, ‘তারা আল্লাহ সম্পর্কে জাহেলি ধারণার ন্যায় অসত্য ধারণা পোষণ করছিল।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৪)

উদ্ভট ধারণা নিয়ে চলা, মানুষকে অহেতুক সন্দেহ করা নিন্দনীয় কাজ। পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

তাই অনুমান করে ছেলেধরা সন্দেহে কেউ প্রকৃতপক্ষে ছেলেধরা হলেও তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া উচিত। কারণ এই একটি গুজব সম্প্রতি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের। কেউ কি ফিরিয়ে আনতে পারবে বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত তুবার মাকে? দুনিয়ার সব কিছু দিয়েও তো তার মায়ের অভাব পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাই কিছু শুনলেই তা যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। কখনো কখনো এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয় গোটা জাতিকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সব শোনা কথা প্রচার ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২)

স্রেফ সন্দেহের ভিত্তিতে তাছলিমা বেগম রেনুকে হত্যার পর জাতি লজ্জিত। কিন্তু এমন জঘন্য কাজ কেন করব, যার জন্য লজ্জিত হতে হয়? কেউ ছিনতাইয়ের কবলে পড়লে আমরা তাকে উদ্ধার না করেই উল্টো পথে পালাতে থাকি, আর ভিত্তিহীন কথা বিশ্বাস করে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ফেলি। এ কেমন মানবতা?

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, (না হলে) তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

তাই আসুন, আমরা সচেতন হই। অনর্থক কাজে আত্মনিয়োগ করা, না জেনে শুধু শুধু নিরপরাধ মানুষের ওপর অপবাদ দেওয়া থেকে বিরত থাকি।

হজরত ওবাদা ইবনু সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী (সা.)-কে ঘিরে একদল সাহাবি বসে ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি তাঁদের উদ্দেশ করে বললেন, আমার হাতে এ কথার বাইয়াত গ্রহণ করো যে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার (জিনা) করবে না, নিজেদের সন্তানাদি (অভাবের দরুন) হত্যা করবে না। কারো প্রতি (জিনার) মিথ্যা অপবাদ দেবে না। শরিয়তসম্মত কোনো বিষয়ে অবাধ্য হবে না। তোমাদের মধ্যে যারা এসব অঙ্গীকার পূর্ণ করতে পারবে, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে পুরস্কার রয়েছে। অন্যদিকে যে লোক (শিরক ব্যতীত) অন্য কোনো অপরাধ করবে এবং এ জন্য দুনিয়ায় শাস্তি পেয়ে যাবে তাহলে এই শাস্তি তার গুনাহ মাফ হওয়ার কাফফারা হয়ে যাবে। আর যদি কোনো গুনাহর কাজ করে, অথচ আল্লাহ তা ঢেকে রাখেন (বা ধরা না পড়ে), এ জন্য দুনিয়ায় এর কোনো বিচার না হয়ে থাকে, তাহলে এই কাজ আল্লাহর মর্জির ওপর নির্ভর করবে। তিনি ইচ্ছা করলে আখিরাতে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন অথবা শাস্তিও দিতে পারেন। বর্ণনাকারী (ওবায়দা) বলেন, আমরা এসব শর্তানুযায়ী নবী (সা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলাম। (বুখারি, হাদিস : ১৮)

Facebooktwitterredditpinterestlinkedin
Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *