ইসলামে প্রতিটি কথা, কাজ ও পদক্ষেপ ইবাদত বলে গণ্য হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক : ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী মানবসৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করেছি, যেন তারা শুধু আমারই ইবাদত করে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)

সুতরাং যে জীবনে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য নেই, যে জীবন তার স্রষ্টার প্রতি বিনম্র ও আত্মসমর্পিত নয়, তা ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থহীন। তবে ইসলামে ইবাদতের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। সাধারণ মানুষ যেগুলোকে ইবাদত মনে করে তাতেই ইবাদতের ধারণা সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবজীবনের প্রতিটি কথা, কাজ ও পদক্ষেপ ইবাদত বলে গণ্য হওয়ার অবকাশ রয়েছে ইসলামে। তা জীবনের যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন। যেমন, মনে মনে আল্লাহকে ভয় পাওয়া এবং তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করাও ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদত।

শরিয়তে ইবাদতের বিভিন্ন শ্রেণি বা বিভাগ রয়েছে। যার কিছু মানুষের জন্য অবশ্যপালনীয় (ফরজ ও ওয়াজিব)। এসব ইবাদত আদায় না করা গুনাহ বা অপরাধ। আবার কিছু ইবাদত এমন যা অবশ্যপালনীয় নয়। যা আদায় করলে ব্যক্তি পুণ্যের অধিকারী হবে। তবে তা ছেড়ে দেওয়া পাপ নয়। ইবাদত তা অবশ্যপালনীয় হোক বা ঐচ্ছিক হোক, মানবজীবনে তার প্রভাব অপরিসীম। মানুষ যখন আল্লাহর নির্দেশ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী কোনো ইবাদত পালন করে, তখন তার সমগ্র জীবনে তার প্রভাব পড়ে।

সৃষ্টিগতভাবে মানুষের ভেতর দুটি প্রবৃত্তি রয়েছে। ভালো ও মন্দ। মানুষ তার প্রভুর আনুগত্য করলে আল্লাহর নৈকট্যের কারণে তার ভেতরের সুপ্রবৃত্তি শক্তিশালী হয়। ফলে তার ভেতর ভালো গুণ ও বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে বান্দা ধীরে ধীরে আল্লাহর রং ধারণ করে। আল্লাহ এ শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘আল্লাহর রং, আল্লাহর রংধারীর চেয়ে উত্তম কে রয়েছে? আমরা তার ইবাদতকারী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৩৮) আর যখন বান্দা আল্লাহর অবাধ্য হয়, তখন আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত ও তার ক্রোধের পাত্র হওয়ায় তার ভেতরের কুপ্রবৃত্তি শক্তিশালী হয়। এতে তার মন্দ স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি পায়। একসময় সে পশুতে পরিণত হয়। বা তারও অধম হয় সে। আল্লাহ তাদের পরিচয়ও দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা হলো পশুতুল্য। বরং তারও অধম। তারা হলো উদাসীন (আল্লাহর স্মরণ থেকে)।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৯)

মূলত ইবাদতের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে মুমিন বান্দার আত্মশুদ্ধি, আত্মিক ও শারীরিক, পার্থিব ও অপার্থিব কল্যাণ লাভ, মানবসমাজে তার মর্যাদা বৃদ্ধিসহ সব কিছু। অবশ্য কোনো বান্দা আল্লাহর কাছে ইবাদতের কতটা বিনিময় লাভ করবে, তা নির্ভর করে ইবাদতে তার নিষ্ঠা, আল্লাহর প্রতি আস্থা, ইবাদত পালনে যত্ন ও আন্তরিকতার ওপর। বান্দা তার আমলের চূড়ান্ত পুরস্কার লাভ করবে কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। যে পুরস্কার ও বিনিময়ের কাছে জাগতিক সব কল্যাণ ও বিনিময় গৌণ।

কোনো ব্যক্তি নিয়মিত আল্লাহর ইবাদত করলে তার ভেতর আল্লাহর অস্তিত্বের অনুভব ও স্মরণ বৃদ্ধি পায়, হৃদয় জাগ্রত হয়। যা মানুষকে হতাশা ও নৈরাশ্য, আশ্রয়হীনতা ও হীনম্মন্যতার মতো নেতিবাচক মনোপ্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করে। কারণ মানুষ যখন আল্লাহর হাতে নিজেকে সমর্পণ করে এবং হৃদয়ে বিশ্বজগতের স্রষ্টার নৈকট্য অনুভব করে, তখন তার ভেতর হতাশা ও নৈরাশ্য, আশ্রয়হীনতা ও হীনতা বাসা বাঁধতে পারে না। বরং মানুষ হিসেবে তার উচ্চমূল্য ও মর্যাদার বোধ জাগ্রত হয়।

মানবজীবনে কিছু কিছু ইবাদতের প্রভাব প্রায় দৃশ্যমান। যেমন, নামাজ মানুষকে আত্মিক ও শারীরিক পবিত্রতা দান করে। মানুষকে মন্দ চরিত্র থেকে রক্ষা করে। অন্যদিকে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় নামাজের ভূমিকা অনন্য। সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে একই কাতারভুক্ত করে। ফলে মানুষ পরস্পরের জন্য সহৃদয় হয় এবং সাম্যের বোধ জাগ্রত করে। নামাজের জামাত মুসল্লিদের শৃঙ্খলা শেখায়। একইভাবে মানবজীবনে রোজার গভীর প্রভাব রয়েছে। রোজার প্রথম অর্জন অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করা। পাশাপাশি কুপ্রবৃত্তি দমনের শক্তি, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের কষ্ট অনুভব করার সুযোগ দেয় রোজা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজায় শারীরিক অনেক উপকারও রয়েছে। জাকাত মানুষের কৃপণতা ও মানসিক সংকট দূর করে। অন্তরে দয়া, মহানুভবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ায়। মানবজীবনে হজের প্রভাবও অত্যন্ত প্রবল। আল্লাহর ঘর কাবাসহ ইসলামের নিদর্শনাবলি মানুষের মনে তাওহিদ ও একত্ববাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে। সারা বিশ্বের মুসলিম পরস্পরের ভাই এবং তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই—এই ধারণাও হজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর জিকির বা স্মরণ দ্বারা মানবহৃদয়কে সজীব ও সতেজ করা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো আমার স্মরণে।’ (সুরা : তহা, আয়াত : ১৪) আর অন্য আয়াতে আল্লাহ জিকিরের উপকারিতা বর্ণনা করে বলেছেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহর স্মরণে তাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়। নিশ্চয় আল্লাহর স্মরণে হৃদয় প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)

অর্থাৎ ইবাদত মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দান করে। ফলে জাগতিক জীবনে স্বস্তি ও স্থিতি লাভ করে। আল্লামা মুকাতিল (রহ.) উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘ইবাদত মানুষের ইয়াকিন বা বিশ্বাসকে দৃঢ় করে। আর এই বিশ্বাসই তার হৃদয়কে প্রশান্ত করে। আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা মানবহৃদয়কে বিক্ষিপ্ত করে, অশান্ত করে তোলে।’ [মাআলিমুত তানজিল, আল্লামা বাগাবি (রহ.)]

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আল্লাহর জিকিরকে মুমিনের জন্য দুনিয়ার জান্নাত আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই দুনিয়ায় একটি জান্নাত রয়েছে। যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করে না, সে পরকালের জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না।’ [আল-ওয়াবিলুস সায়ব, আল্লামা ইবনে কায়্যিম জাওঝি (রহ.)]

মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকদের দাবি, যেহেতু মহান আল্লাহ জগত্গুলোর স্রষ্টা ও নিয়ন্তা, তাই সৃষ্টিজগতের শান্তি ও স্থিতি তাঁর স্মরণ, ইবাদত ও নৈকট্যের সঙ্গে জড়িত। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্কই মানবজীবনের শান্তি, স্বস্তি, স্থিতি, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি, সাফল্য ও ব্যর্থতার মতো জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো নির্ধারণ করে। তবে আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ক শুধু প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে আবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস, ভক্তি, ভালোবাসা, আস্থা ও আবেগ। বান্দা যখন তার স্রষ্টার ইবাদতে মগ্ন হয়, তখন সশ্রদ্ধ ভালোবাসায় তার হৃদয় বিগলিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন মুমিন বান্দার কাছে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়, তাদের হৃদয় বিগলিত হয়।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২)

বিপরীতে বান্দা যখন আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তখন তার হৃদয় বিষাদে ভরে যায়। জগতের নানা প্রতিকূলতা তাকে বিচলিত করতে থাকে। সীমাহীন প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও সে নিজেকে অসহায় ও আশ্রয়হীন মনে করতে থাকে। জগতের সম্পদ ও শক্তি তার হৃদয়কে প্রশান্ত করতে পারে না। অজানা ভয় ও আশঙ্কা তাকে বিচলিত করে তোলে। ফলে আরাম-আয়েশের যাবতীয় উপকরণ তার কাছে অর্থহীন ও অকার্যকর মনে হয়। মুসলিম দার্শনিকদের দাবি, যে ব্যক্তি নিজের স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করতে পারে না, পৃথিবীর কোনো কিছুর ওপর সে আস্থাবান হতে পারে না। ফলে অনিশ্চয়তা ও অনিরাপদ বোধ তার হৃদয়কে অস্থির করে তোলে। মানসিক প্রশান্তি তার কাছে সুদূরপরাহত বিষয় বলেই মনে হয়। পরকালের মর্মন্তুদ শাস্তি তো রয়েছেই। আল্লাহ তাআলা সে দিকে ইঙ্গিত করেই বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হয় তার জন্য রয়েছে সংকীর্ণ জীবন। পরকালে আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।’ (সুরা : তহা, আয়াত : ১২৪)

আল্লাহ সবাইকে তাঁর আনুগত্যে ভরপুর জীবন দান করুন। আমিন।

লেখক : সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিসি), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

Facebooktwitterredditpinterestlinkedin
Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *