তারা হাঁটেন চার পায়ে

নিউজ ডেস্ক : চারদিকে ফিরে দেখলে অনেক কিছুই দেখা যায়। কিন্তু চারপায়ের মানুষ দেখেছেন? তুরস্ক-সিরিয়া সীমানার কিছুটা উত্তরে মানুষ হয়েও মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। হেঁটে চলেন চার পায়ে। তুরস্কের নাগরিক ওই মানুষগুলো অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সামনের দিকে ঝুঁকে মুখটা উপরের দিকে তুলে দু’হাত আর দু’পায়ের সাহায্যে এগিয়ে চলেন। দূর থেকে দেখে মনে হবে ঠিক যেন চারপেয়ে কোনো পশু ধীর গতিতে হেঁটে চলেছে। ২০০৫ সালে বিবিসির একটি তথ্যচিত্রে প্রথম তাদের কথা সারা বিশ্বের মানুষ জানতে পারে।

চারপেয়ে মানুষের খোঁজ পাওয়ার পর থেকে মাঝেমধ্যেই বিজ্ঞানীদের দল গিয়েছে তুর্কির ওই গ্রামে। রক্তের নমুনা, মস্তিষ্কের স্ক্যান, বাদ যায়নি কোনো পরীক্ষাই। কিন্তু ২০১৪ পর্যন্ত এমন ব্যবহারের সঠিক কোনো কারণ কেউ খুঁজে পাননি।

তুর্কির ওই পরিবারটির বাস তুরস্ক-সিরিয়া সীমানার কিছুটা উত্তরে। বাবা-মাকে নিয়ে ওই পরিবারের মোট সদস্য ২১ জন। এই ২১ জনের পরিবারে ৫ ভাই-বোনের মধ্যে এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ওই ৫ ভাই-বোনের মধ্যে চার বোন ও এক ভাই। সাফিয়ে, হেসার, সেনেম, এমিন এবং ভাই হুসেইন। বাকি ভাই-বোনেরা চারপেয়ে না হলেও কেউই পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। এদিকে তাদের বাবা-মা কিন্তু একেবারেই স্বাভাবিক। আর এই ৫ জন শুধু যে চারপেয়ে তাই নয়, তাদের কোনো কিছু বুঝতে এবং কথা বলতেও সমস্যা হয়। তারা নিজেদের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কথা বলেন।

প্রথম এ পরিবারের খোঁজ পান তুরস্কের বিজ্ঞানী উনের ট্যান। তার এই খোঁজ তখনো কোনো জার্নালে প্রকাশিত হয়নি। অপ্রকাশিত এই রিসার্চ পেপার চোখে পড়ার পরই প্রাণীদের বিচিত্র আচরণ নিয়ে কাজ করা এক প্রাণিবিদ বিবিসির প্রতিবেদক হাম্পফ্রেকে ফোনে বিষয়টা জানান। বিবিসি তথ্যচিত্র প্রকাশ করলে বিশ্ব এই ঘটনার কথা জানতে পারে।

বিজ্ঞানী উনের ট্যান তার অপ্রকাশিত রিসার্চ পেপারে লিখেন, এই ঘটনা আসলে বিপরীত বিবর্তনের ফল। অর্থাত্‍ বিবর্তন হয়ে ক্রমশ যেমন বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি এবং ক্রমশ আদিম মানুষ পরিবর্তিত হয়েছে সভ্য মানুষে, এ ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক তার উল্টো।

এদিকে বিজ্ঞানীর নাম অনুসারে একে ‘উনের ট্যান সিন্ড্রোম’ বলা হয়। তবে সত্যিই কি বিষয়টা তাই? উনের ট্যানের দাবি, যদি সত্যি হয়ে থাকে, তা হলে যে কোনো সময়ে যে কোনো পরিবারে এমন ঘটনা কি ঘটতে পারে? সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে উনের ট্যানের গবেষণা। পরে জানা যায়, উনের ট্যানের এই তথ্য ভুল। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪-এ সময়কালের মধ্যে বহু গবেষণা হয়েছে ওই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। অবশেষে সেই গবেষণাতেই আসল কারণ ধরা পড়ে ২০১৪ সালে। জানা যায়, বিপরীত বিবর্তন নয়, এটা আসলে জিন মিউটেশনের ফল। এটা অতি দুর্লভ একটা রোগ।

এ রোগে তাদের সেরিবেলার হাইপোপ্লাসিয়া অর্থাত্‍ দেহের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারেন না। বায়োলজি জার্নাল প্লাসে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, তারা চারপেয়ে হলেও হাঁটার ধরন কিন্তু একেবারেই পশুর মতো নয়। কারণ পশু যখন হাঁটে সামনের ডান ও পিছনের বাঁ পা এক সঙ্গে এবং সামনের বাঁ পায়ের সঙ্গে পিছনের ডান পা সামনে এগিয়ে নিয়ে চলে। কিন্তু তারা তা করেন না। বাঁ হাতের সঙ্গে বাঁ পা-ই এগিয়ে নিয়ে চলেন।

পশুর হাঁটার সঙ্গে আরো অমিল রয়েছে তাদের হাঁটার। পশু কব্জির উপর ভর দিয়ে হাঁটে না। বাহুর সঙ্গে আঙুলের সংযোগকারী অংশের উপর ভর দিয়ে হাঁটে। কিন্তু তারা কব্জির উপর ভর দিয়ে হাঁটেন। এভাবে দীর্ঘ দিন ধরে হাঁটার ফলে তাদের তালু শক্ত হয়ে গেছে।

তাদের আশপাশের লোকেরা পশুর মতোই ব্যবহার করেন তাদের সঙ্গে। কখনও ঢিল ছুড়তে থাকে তাদের দিকে, তো কখনও নানাভাবে বিরক্ত করেন। তাই বাড়ি এখন তাদের কাছে সব। বের হন না বাড়ি থেকে। তাদের জন্য আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে তা নিয়ে চিন্তা করে চলছেন তাদের বাবা-মা। কারণ অনেক চিকিত্‍সা সত্ত্বেও এই রোগের কোনো উপশম বের হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.