জীবনের গান এক তারের বেহালায়

অনলাইন ডেস্ক: পাড়ার গলির মাথা থেকে ভেসে আসছে বেহালার সুকরুণ সুর। খানিক বাদে দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসেন বাজিয়ে লোকটি। রোদে পোড়া তামাটে চেহারা। কাঁধে ঝোলা। ফিতায় বাঁধা লম্বা চুল। দেখা গেল, হাতে তৈরি মাটি-বাঁশের বেহালায় তিনি বিরহের সুর বাজাতে বাজাতে হেঁটে চলেছেন। আর তাঁর পেছনে পেছনে ছুটে চলেছে ছোট ছেলেমেয়েদের দল।
চকিতে মনে পড়ে, শিল্পী কবীর সুমনের ‘ও গানওলা’ গানটির কথা। নোবেল বিজয়ী গীতিকবি বব ডিলানের মি. ট্যাম্বোরিন ম্যান-এর ছায়া অবলম্বনে লেখা ওই গানেও এমন এক বেহালাবাদকের দেখা মেলে। একদিন ঘুমভাঙা সকালে গানের ছেলেটার যখন কিছু করার ছিল না, যাওয়ার ছিল না কোথাও, তখন সে গানওলাকে অনুরোধ করেছিল আরেকটি গান গাইবার জন্য। গানেই সে বলে উঠেছিল, ‘ছেলেবেলার সেই বেহালা বাজানো লোকটা/ চলে গেছে বেহালা নিয়ে/ চলে গেছে গান শুনিয়ে।’

‘এই পাল্টানো সময়ে’ যখন ‘স্বপ্নের পাখিগুলো বেঁচে নেই’, তখন চেনা নাগরিক পরিসরে সুমনের গানের সেই বেহালা বাজানো লোকটিই কি আবার ফিরে এল? জবাব মেলে না। কিন্তু কথা হয় বেহালা বাজাতে বাজাতে পশ্চিম শেওড়াপাড়ার পানির ট্যাংকির গলিতে চলে আসা মো. সালাউদ্দিনের সঙ্গে। জানা যায়, তাঁর নিবাস মিরপুরের উত্তর বিশিল এলাকায়। ৪০ বছর ধরে এভাবেই তিনি ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বেহালা বাজিয়ে চলেছেন। মাটি ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এক তারের এই বেহালা বিক্রি করেই চলে তাঁর সংসার।

গলিতে একটা চায়ের দোকানে সালাউদ্দিনের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন আশপাশে অনেক মানুষের ভিড়। তাঁদের অনেকেই তাঁকে চেনেন। ভালোবাসেন। সালাউদ্দিন বলেন, ‘মানুষের এই ভালোবাসাই আমাকে এই পেশা থেকে অন্য কোথাও যেতে দেয়নি। আমার বাজনা শুনে বাড়ির বউ-ঝিরাও বেরিয়ে আসে। অনুরোধ করে পছন্দের কোনো সুর বাজাতে। সংগীত তো আত্মার যত্ন নেয়। আমার বাজানো সুরে অনেকের দুঃখে প্রলেপ পড়ে। কেউ খুশি হয়ে বাচ্চার জন্য একটা বেহালা কিনে নেয়। সম্মান করে। আমার শ্রমের সার্থকতা এটুকুই।’

খেয়াল করে দেখা গেল, সালাউদ্দিনের বেহালার মূল কাঠামো বাঁশের। তার এক প্রান্তে মাটির ছোট পাত্রের ওপর চামড়ার পাতলা ছাউনি। বাঁশের ছড়ে যুক্ত প্লাস্টিকের সুতা। প্রতিটি বেহালা তিনি বিক্রি করেন ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। প্রতিদিন ৫০-৬০টি বেহালা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। বেশির ভাগ বিক্রি হয়ে যায়। মেলা-পার্বণে বিক্রির পরিমাণ বাড়ে। তবে সালাউদ্দিনের হাতের বেহালাটি বিশেষ ধরনের। এর ছড় আসল বেহালার ছড়ের মতোই, ঘোড়ার লেজের লম্বা লোম দিয়ে তৈরি। এই ছড়সহ বেহালা কিনতে ক্রেতাকে হাজার টাকা খরচ করতে হবে।
গল্পে গল্পে জানা যায়, সালাউদ্দিনের দাদা বাচ্চু মিয়া সেই ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে এসে ঢাকায় থিতু হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এমন মাটির বেহালার বাদক। তারপর সালাউদ্দিনের বাবা মনু মিয়ার হাত ধরে তৃতীয় প্রজন্মে এক তারের বেহালায় সুর তুলছেন সালাউদ্দিন। তিনি এই বেহালার নাম দিয়েছেন ‘বাংলা বেহালা’।
সালাউদ্দিন বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের কেউ আমার পথ মাড়ায়নি। তবে আমার আট বছরের নাতনি সাইমা আমার বাজনা খুব পছন্দ করে। এখন তাকেই বাজানো শেখাচ্ছি। আমার মৃত্যুর পর সেই হয়তো এই পেশাটাকে ধরে রাখবে।’ কেবল বেহালা বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চলে?জবাবে সালাউদ্দিন হালকা চালে বলে ওঠেন, ‘শিল্পীর জীবনে কষ্ট থাকবেই। বেহালা বিক্রির পাশাপাশি কিছু সামাজিক অনুষ্ঠানেও মাঝেমধ্যে ডাক পড়ে। সেখান থেকে কিছু টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময় দেশের নানা এলাকার বিখ্যাত মেলাগুলোতে যাই। মেলায় বিক্রি খারাপ হয় না। সব মিলিয়ে চলে যায় আর কী।’
ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ধার খুব একটা ধারেন না সালাউদ্দিন। তবে ৬০ বছর বয়সে এসে কিছুটা অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তার বোধ পেয়ে বসেছে এই বেহালাবাদককে। ভাড়া বাড়িতে থাকেন। সঞ্চয় বলতে কিছু নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.