কুষ্টিয়া জেলা শব্দ দূষণের প্রতিযোগীতায় ,এক ধাঁপ এগিয়ে

কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি: কুষ্টিয়া জেলায় বসবাসকারী মানুষের প্রতি দিন সকালে ঘুম ভাঙ্গে বিভিন্ন স্কুল, কোচিং সেন্টার, কলেজ ও বিভিন্ন ডাক্তারের বিজ্ঞাপনে।এ মাইক বাজানোর কারনে একদিকে যেমন হচ্ছে শব্দ দূষন তেমনি হচ্ছে যানযট।বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরে অধিকাংশ সময় যানজট থাকে যেমন: কলেজ মোড় , চার রাস্তার মোড় হাসপাতাল মোড় , বড় বাজার রেল গেটে আর তার ভেতর ৪-৫ টা মাইক বাহি রিস্কা,ভ্যান । এলাকায় কারোর বিয়ে ,গায়ে হলুদ, সুন্নতেখাৎনা অনুষ্ঠানের গান বাজানোর কথা শুনলেই মনের মধ্যে ভয় কাজ করে। এছাড়া নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইকে গান বাজানো একটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী বা বিশেষ দিবসগুলোতে সারাদিন-রাত ধরে উচ্চশব্দে মাইক বাজালেও কেউ তার প্রতিবাদ করার সাহস পান না৷আর শীতকাল এলেই এলাকায় এলাকায় ওয়াজ মাহফিল, পূঁজা কোথাও আবার কীর্তন ,এসব মাহফিলে একাধিক মাইক বাজানো হয় উচ্চশব্দে৷ ফলে শব্দ দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে৷ আর শহরে যানবাহনের অতিরিক্ত শব্দ তো আছেই৷
২০০৬ সালে বাংলাদেশ শব্দ দূষণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এই নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা হলো ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। একইভাবে নীরব এলাকার জন্য এ শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর ওপরে শব্দ সৃষ্টি করাকে দন্দনীয় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় বলা আছে, আবাসিক এলাকার সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণকাজের ইট বা পাথর ভাঙার যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। যানবাহনে অপ্রয়োজনে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানো যাবে না। এই বিধির আওতায় স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের চতুর্দিকে ১০০ গজের ভেতরে কোনো প্রকার হর্ন বা মিউজিক সিস্টেম বাজানো যাবে না। আরো বলা হয়েছে, কোনো উৎসব, সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকার, এমপ্লিফায়ার বা কোনো যান্ত্রিক কৌশল ব্যবহার করতে হলে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি লাগবে। এসব কার্যক্রম সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টার বেশি হবে না। পাশাপাশি রাত ১০টার পর কোনোভাবেই শব্দ দূষণকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী কোনো এলাকা ৬০ ডেসিবেল মাত্রার বেশি শব্দ হলে সেই এলাকা দূষণের আওতায় চিহ্নিত হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল, হাসপাতালে ২০ থেকে ৩৫ ডেসিবেল, রেস্তোরাঁ ৪০ থেকে ৬০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা সহনীয়। ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে এবং ১০০ ডেসিবেল শব্দে চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। বসরকারি সংস্থা ‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’ নির্ধারিত মানবদহের চেয়ে গড়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি শব্দ সৃষ্টি হয় আমাদের দেশে৷ ‘ঢাকা শহরের বেশিরভাগ এলাকায় এখন শব্দের সার্বক্ষণিক গড় মাত্রা ১০০ ডেসিবেল। কোথাও কোথাও শব্দের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রার তিনগুণেরও বেশি৷ আমরা ইনডোর শব্দ দূষণের দিকটি বিবেচনায় নেই তাহলে টাইলস লাগানো, মিউজিক সিস্টেমে জোরে গান বাজানো, ড্রিলিং এগুলোর শব্দ রয়েছে৷”উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, আলসার, বিরক্তি সৃষ্টি হয়৷ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শিশু এবং বয়স্করা৷ এমনকি গর্ভে থাকা সন্তানও শব্দদূষণে ক্ষতির শিকার হয়, অর্থাৎ তাদের শ্রবণশক্তি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় শব্দ দূষণের ফলে সড়কে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে৷ কারণ শব্দ দূষণে মেজাজ খিটখিটে হয়, মনোযোগ নষ্ট হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়৷ বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে৷ আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদন্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবে এই আইনের তেমন প্রয়োগ দেখা যায় না‘‘আইনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ আরো কিছু বিষয়ে ব্যতিক্রম আছে ৷ পুলিশের স্বপ্রণোদিত হয়ে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার আছে৷ আর পাবলিক অনুষ্ঠানের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে। কুষ্টিয়া নগরীর মানুষ শব্দ দূষনের বিষয়টিতে, প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষ্যেপ দেখতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.