সায় দিলেও ঐক্যের ইজতেমায় মেটেনি বিরোধ

ন্যাশনাল ডেস্ক: ঐক্যবদ্ধভাবে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনে সম্মত হলেও বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়ের আহমেদ এবং দিল্লির মাওলানা মোহাম্মদ কান্ধলভি সাদপন্থিদের দ্বন্দ্বের নিরসন হয়নি। তবলিগ-জামাতের পুরনো ধারায় একপর্বের ইজতেমাকে জুবায়েরপন্থিরা ইতিবাচক মনে করলেও সাদের অনুপস্থিতি, নাশকতা-সংঘাতের আশঙ্কায় এখনো আলাদা আয়োজনের পক্ষে তার অনুসারীরা। মাওলানা সাদের অনুসারীরা বলছেন,সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপে তারা এবারের ইজতেমায় মাওলানা সাদকে না রাখতে রাজি হয়েছেন। তবে আখেরি মোনাজাতে ‘বিশ্ব আমির’ সাদের অনুপস্থিতিসহ ইজতেমা শেষে নিজেদের পক্ষে দোয়া করার মুরব্বি, ৫৪টি নজমের (সেবা সার্ভিস) জিম্মাদার, খিত্তার আমির কে হবেনÑ সে বিষয়ে তারা উদ্বেগে রয়েছেন। সর্বশেষ গত শুক্রবার কাকরাইলের ‘মাদ্রাসা উলুমি দীনিয়া মালওয়ালী মসজিদ’-এর প্যাডে মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের স্বাক্ষরিত একটি ইজতেমার দাওয়াতপত্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পর এ দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়। যে কারণে শনিবার সাদপন্থিরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে “তবলিগের দুপক্ষের একসঙ্গে ‘এক ইজতিমা’ করার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলো এবং ‘টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা সফলে জরুরি বিষয়সমূহ” শীর্ষক তিন পৃষ্ঠায় দুটি প্রস্তাবনা তৈরি করেন তারা। ইজতেমা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরবর্তী সভায় এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরা হতে পারে।সাদপন্থিদের ওই প্রস্তাবনায় বলা হয়, যাবতীয় সমস্যা এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে প্রথম ধাপে নিজামুদ্দীন মারকাজের অনুসারীরা (সাদপন্থি) এবং দ্বিতীয় ধাপে অন্য পক্ষ (জুবায়েরপন্থি) ইজতেমা করতে পারেন। ইজতেমায় পছন্দমতো দেশি-বিদেশি মেহমান আনা, বয়ান, আ’মাল, তদারকি, দোয়া ইত্যাদি দুপক্ষ যার যার মতো করে করবেন। একপক্ষের সাথিরা অন্যপক্ষের ইজতেমায় আসবেন না।মাওলানা সাদপক্ষের বিদেশি তশকিল জামাতের প্রধান মাওলানা রেজা আরিফ আমাদের সময়কে বলেন, ১ ডিসেম্বর টঙ্গীর অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় উভয়পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ-রাগ এখনো আছে। প্রতিশোধের মানসিকতাও দেখা যাচ্ছে। ময়দানে লাখ লাখ সাথি রান্নাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে শাবল, দা, বঁটি, লাকড়ি, লাঠি ইত্যাদি আনবেন। এতে কোনো একজন উত্তেজনা সৃষ্টি করলে ভয়াবহ কিছু হতে পারে। তখন পুলিশ, র্যাবের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হবে। আমরা চাই আলাদা ইজতেমা হোক। রেজা আরিফের অভিযোগ, মাওলানা জুবায়ের স্বাক্ষরিত চিঠিতে মাওলানা সাদকে ‘স্যাড’ পাগল বলে অভিহিত করা হয়েছে।অন্যপক্ষ মাওলানা জুবায়ের আহমেদের ছেলে মাওলানা হানজালা বিন জুবায়েরের ভাষ্য, তবলিগ-জামাত নিয়ে কোনো পক্ষ বা গ্রুপিং নেই, সবাই এক সঙ্গে।

আমাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে সাদ আসবেন না, একবারে এবং ঐক্যবদ্ধ ইজতেমা হবে। তিনি বলেন, শুধু পৃথিবীতে একজনের বিরুদ্ধে ফতোয়া এসেছে তিনি মাওলানা সাদ। দারুল উলুম দেওবন্দ ২০১৮ সালে তার ৬০টি ভুল ধরেছে। তিনি (সাদ) শেষ নবীসহ অন্য নবীদের বিরুদ্ধে, এমনকি আল্লাহর হাতে হেদায়েত নেই বলেছেন। ওসব থেকে বাঁচার জন্য শুধু টাকা-পয়সার উদাহরণ টেনে মানুষকে ভুল বোঝানো হচ্ছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাওলানা সাদ ঠেকানোর কারণে শুরু থেকেই বাংলাদেশে তার প্রধান অনুসারী মাওলানা সৈয়দ ওয়াসেক ইসলামপন্থিরা আলাদা ইজতেমা আয়োজনের কথা বলে আসছিল। জুবায়েরপন্থিরা চাচ্ছে ঐক্যবদ্ধ ইজতেমা। আবার মাওলানা সাদকে বয়কটের পাল্টা হিসেবে জুবায়েরপন্থি দিল্লির মুরব্বি ‘মাওলানা আহমেদ লাট এবং ইব্রাহিম দেওয়ালা গুজরাটিকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাদের অনুসারীরা। উভয়পক্ষ এখনো একে অপরকে এড়িয়ে ইজতেমার কার্যক্রম শুরুসহ নিজেদের মূলধারার এবং সারাদেশে তবলিগ-জামাতের সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থন রয়েছে বলে দাবি করছেন।দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতার দাবিদার শোলাকিয়া ঈদের জামাতের ইমাম মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসঊদ আমাদের সময়কে বলেন, ভারত বিভক্তির সময় থেকেই সাদ-জুবায়েরপক্ষের দ্বন্দ্ব শুরু। এটা এখন উত্তরসূরিদের মধ্যে ঠেকেছে। তাই দ্বন্দ্বের মূল দিল্লিতে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে কেউ কেউ এখনো ফেসবুকে উসকানিমূলক স্ট্যাটাসসহ ঐক্যবদ্ধ ইজতেমার মাঠে মাদ্রাসা ছাত্র, বিবদমান আলেমদের জন্য আলাদা তাঁবু নির্মাণের পরামর্শ তার।

দুপক্ষের বিরোধের মুখে এ মাসে অনুষ্ঠিতব্য টঙ্গীর ইজতেমা স্থগিতের ঘোষণা দেয় সরকার। তা উপেক্ষা করে টঙ্গীর মাঠ দখল নিয়ে গত ১ ডিসেম্বর সাদ-জুবায়েরপন্থিদের মধ্যে সংর্ঘষে এক বৃদ্ধ নিহতসহ দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। বিরোধ মেটাতে ২৩ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উভয়পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে বিবদমান দুপক্ষ একে অপরকে জড়িয়ে কোলাকুলিসহ কেঁদে ফেলেন। অতীত ভুলে একসঙ্গে শান্তির পক্ষে কাজ করার প্রতিজ্ঞাও করেন জুবায়ের আহমেদ এবং মাওলানা সাদের অনুসারী সৈয়দ ওয়াসেক ইসলাম পক্ষ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সরকারের উদ্যোগে আপস-মীমাংসায় আশার বাণী দেখা গেলেও মূলত মাওলানা সাদকে আনতে তার পক্ষ এখনো একাট্টা।মাওলানা সাদের একজন অনুসারী বলেন, ‘চাপে পড়ে’ সাদ সাহেবের বিষয়ে ছাড় দেওয়ায় জুবায়েরপন্থিরা একে তাদের বিজয় আখ্যায়িত করছেন। বলা হচ্ছে- মাওলানা সাদ ‘গোমরাও’ পথভ্রষ্ট হয়েছেন। অথচ তিনি (সাদ) বিশ্বের অনেক দেশে ইজতেমা করছেন। তার অনুপস্থিতিতে কুয়েত, নাইজেরিয়া, ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবের মেহমানরা ফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।সাদপন্থি ওই শীর্ষনেতা বলেন, সাদ সাহেব হযরত উমরের বাণী, এলেম-আলেমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেনÑ ‘ওয়াজ-মাহফিলে টাকা নেওয়া যাবে না।’ অনেকে ওয়াজ মাহফিল করে, মুরগি জবাই করে পর্যন্ত টাকা নির্ধারণ করে দেয়। এটা বলায় জুবায়েরপন্থিরা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ।এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ মাওলানা জুবায়েরের ছেলে হানজালা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে মন্ত্রীর সামনে তারা (সাদপন্থি) অত্যন্ত বাজে আচরণ করেছেন। কিন্তু আমরা মন্ত্রীদের ওপর ভরসা রাখছি। তারাই ঠিক করবেন আমবয়ান, মোনাজাতে কারা থাকবেন। আহমেদ লাট ও ইব্রাহিম দেওয়ালার বিষয়ে হানজালা বিন জুবায়ের বলেন, তারা (সাদপন্থি) অভিযোগ দিয়েছেন কিন্তু মন্ত্রীরা এটা নিয়ে কর্ণপাতই করেননি।দ্বন্দ্বের বিষয়ে জানতে চাইলে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ অ্যাডভোকেট শেখ মো. আবদুুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, তবলিগ-জামাত শুরু থেকে এক সঙ্গে একভাবে চলছে। মাঝখানে বিভক্তির কারণে কাকরাইল মসজিদসহ জেলায়-জেলায় গোলমাল হয়েছে। এগুলো তবলিগের কাজ নয়।

তবলিগের মতো অরাজনৈতিক ধর্মীয় কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সবার প্রচেষ্টায় এক সঙ্গে ইজতেমার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে গোলমাল থাকায়, এখন কে জিতল আর কে হারল এ নানা মেরুকরণের কারণে কেউ ক্ষোভের কথা বলতে পারে বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুক্রবার রাতেও সবার সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই আন্তরিক আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.