নিজস্ব প্রতিবেদক : মহাষষ্ঠীতে মাতৃত্ব ও শক্তির প্রতীক দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানোর মাধ্যমে শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।এদিন বেলতলায় ত্রিনয়নী দেবীর নিদ্রাভঙ্গের আবাহন- অর্থাৎ বোধনের মাধ্যমে দুর্গোৎসবের আচার পর্ব শুরু হবে।বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের শেষ হবে। আবার এক বছরের জন্য ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসে দেবালয়ে।হিন্দু আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা- এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব।
আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ দিনে মহাষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে দশম দিনে বিজয়া দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা থাকে ৫ দিন। তবে এবার মহাসপ্তমী তিথি শনি ও রবিবার দুদিন বিস্তৃত হওয়ার এবারের এই আনন্দোৎসব চলবে ৬ দিন।
মহাষষ্ঠীর দিনে শুক্রবার ষোড়শ উপচারে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানো হবে। ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে শুরু হবে মূল আচার।
শনিবার সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের পর শুরু হবে মহাসপ্তমীর পূজা। সোমবার মহাঅষ্টমী পূজা, সেদিন হবে সন্ধিপূজা। মঙ্গলবার বিহিত পূজার মাধ্যমে হবে মহানবমী পূজা। আর বুধবার দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, দশভূজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি শরতে কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে মর্ত্যলোকে আসেন। সন্তানদের নিয়ে পক্ষকাল পিতার গৃহে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে।
আশ্বিন শুক্লপক্ষের এই ১৫টি দিন দেবীপক্ষ, গত শনিবার মহালয়ার দিনে মণ্ডপে-মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, মঙ্গলঘট স্থাপন, ঢাক-কাঁসা ও শঙ্খ বাজিয়ে দেবীকে আহ্বান জানিয়ে যে পক্ষের শুরু হয়েছিল।
এর মাঝে ষষ্ঠ দিন, অর্থাৎ ষষ্ঠীতে বোধন। আর দশম দিন, অর্থাৎ দশমীতে বিসর্জন। দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। আর দেবীপক্ষের সমাপ্তি হবে পঞ্চদশ দিনে কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার মধ্যে দিয়ে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, তিন অবতারের আবির্ভাবকাল ত্রেতাযুগে ভগবান রাম তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গার সাহায্যে রাবণ বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। দেবীর সেই আগমণের সময়ই দুর্গোৎসব।
রাম শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে এ পূজা শারদীয় দুর্গাপূজা নামেও পরিচিত। আর মর্ত্যলোকে আসতে দেবীর সেই ঘুম ভাঙানোকে বলা বলা হয় অকাল বোধন।
পুরোহিতরা বলছেন, দুর্গা দেবীর প্রকৃত আগমনের সময় চৈত্র মাস। অর্থাৎ বসন্ত কাল। চৈত্র মাসে যে দুর্গাপূজা হয় তাকে বলা হয় বাসন্তী পূজা। তবে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে শারদীয় পূজাই সবচেয়ে বড় উৎসব।
শাস্ত্র মতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন নৌকায়। দেবীর ঘোড়ায় আগমন ছত্রভঙ্গ বা অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়, যা সাধারণত বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত।
আজ ষষ্ঠী তিথিতে সায়ংকালে অর্থাৎ সন্ধ্যায় দেবীর বোধন অনুষ্ঠিত হবে। শনিবার ও রবিবার পালিত হবে মহাসপ্তমী। এবার তিথির কারণে সপ্তমী দুই দিন স্থায়ী হবে। এ তিথিতে নবপত্রিকা স্নান ও পূজার প্রচলিত রীতি অনুসরণ করা হবে। দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে নয়টি উদ্ভিদ একত্র করে স্নান করানোর মধ্য দিয়ে এ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। সোমবার পালিত হবে মহাঅষ্টমী। এদিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন সন্ধিপূজা। অষ্টমী তিথির শেষ ও নবমী তিথির শুরুর সন্ধিক্ষণে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমী তিথিতে বেশ কিছু মন্দিরে কুমারী পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার মহানবমীর পূজা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উৎসবের শেষ পর্যায় শুরু হবে। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসব; বিদায় জানানো হবে দেবী দুর্গাকে।
রাত পোহালেই ঢাকের বাদ্যে শুরু দুর্গোৎসব। এরই মধ্যে প্রতিমা তৈরির শেষ পর্যায়ের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও কারিগররা। পূজার আগমুহূর্তে প্রতিমায় রং করা, সাজসজ্জা ও অন্যান্য কাজ দ্রুত শেষ করতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আজ সায়ংকালে দেবীর বোধন অনুষ্ঠিত হবে। এসময় আসনে অধিষ্ঠিত হবেন দেবী দুর্গা। এই নির্ঘণ্ট মেনে দেশের পূজা মণ্ডপগুলোতে চলছে দেবী দুর্গাকে বরণের প্রস্তুতি। এ বছর ঢাকায় ২৫৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে এবং সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। আলোকসজ্জায় রঙিন হয়ে উঠেছে রাজধানী। পালবাড়ি থেকে পূজামণ্ডপে প্রতিমা আনার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পূজা কমিটির সদস্যরা।
দুর্গাপূজা ঘিরে থাকছে নি-িদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা : শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা দেশে ৩৩ হাজার ৯৭টি পূজামণ্ডপে ২ লাখ ১২ হাজার ১১৪ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপ এলাকায় বাড়তি নজরদারির পাশাপাশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও ভিডিপি, কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে নি-িদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
গতকাল আনসার-ভিডিপি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, প্রতিটি ম পে আনসার ও ভিডিপি মোতায়েন ছাড়াও থাকছে বিশেষ স্ট্রাইকিং টিম। ‘সুরক্ষা’ অ্যাপের মাধ্যমে পূজা কমিটি ও মণ্ডপের তথ্য পৌঁছে যাবে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে। যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি, অপতৎপরতা মোকাবিলায় ডগ স্কোয়াড ও বম্ব ডিসপোজাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৭ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে ১০৪টি বিশেষ স্ট্রাইকিং টিম। পাশাপাশি গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে জোরদার করা হয়েছে সাইবার নজরদারি। অপপ্রচার মোকাবিলায় সাইবার নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, যাচাই করা তথ্য দ্রুত প্রকাশ করা গেলে বিভ্রান্তি কমানো সম্ভব।
রাজধানীর রমনা কালীমন্দিরে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, সীমান্তের ৮ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা প্রায় ১ হাজার ৮০০ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা দেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ লক্ষ্যে সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে ১৮টি বেসক্যাম্প স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক ২৪ ঘণ্টা নজরদারি ও যোগাযোগের জন্য বিজিবি সদর দপ্তরে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।
অন্যদিকে পূজার নিরাপত্তায় দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ৩ হাজার ৪০০ সদস্য মোতায়েন করবে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, কোস্টগার্ড দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ঢাকা জোন ৩৭টি, পূর্ব জোন (চট্টগ্রাম) ৬৩টি, পশ্চিম জোন (মোংলা) ১৪৪টি ও দক্ষিণ জোন (ভোলা) ৩৭১টিসহ সর্বমোট ৬১৫টি মন্দির ও পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে। এসব ম পে টহল কার্যক্রম বৃদ্ধিসহ স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসন, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজা উদ্যাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নি-িদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
এসআরবি জানিয়েছে, দেশব্যাপী ১৫টি ব্যাটালিয়নের ৬ হাজারের অধিক এসআরবি সদস্য সার্বক্ষণিক দুর্গাপূজার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষ নির্দেশনার মাধ্যমে প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফে নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে নানা প্রস্তুতির কথা বলেছে।






Leave a Reply