নিজস্ব প্রতিবেদক : শারদীয় দুর্গাপূজায় সপ্তমী নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন অনেক ভক্ত। পঞ্জিকা অনুযায়ী এবার সপ্তমী পড়েছে দুই দিন।
এবার সপ্তমী তিথি শুরু হবে ১৮ অক্টোবর, রবিবার বিকাল থেকে এবং তা থাকবে ১৯ অক্টোবর, সোমবার বিকাল পর্যন্ত। হিন্দু শাস্ত্রমতে, সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি থাকে, সারাদিন সেই তিথি ধরা হয়। তিথির সময়কাল ২৪ ঘণ্টার বেশি হওয়ায় দুই দিনের সূর্যোদয়ই পাচ্ছে সপ্তমী তিথিকে। শাস্ত্র অনুযায়ী, দুই দিন সপ্তমী থাকলেও উৎসবের ক্ষণ গণনায় কোনো প্রভাব পড়বে না।
ভক্তরা মহা সপ্তমীর দিনই অঞ্জলি দিতে পারবেন।হিন্দু পঞ্জিকায় তিথির হিসাব চন্দ্রের গতির ওপর নির্ভর করে। কোনো কোনো বছর একটি তিথি দুই ক্যালেন্ডার দিনে বিস্তৃত হয়। ফলে ভক্তরা দুই দিনই মহাসপ্তমীর পূজা, অঞ্জলি ও আরাধনা করতে পারবেন।
মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটি জানায়, সপ্তমী দুইদিন হওয়ার কারণ হচ্ছে, এটাকে আমাদের ব্রহ্ম মুহূর্ত বলে। ভোরবেলা ওই মুহূর্ত টাচ করতে হয়, নাহলে পূজা সপ্তমী শেষ হয় না।
পুরোহিত দেবদাস গোস্বামী জানান, এই তিথিটা যখন সংযোগ হয় কোনে কোনো সময় একই তিথি দেখা গেছে টাইমের সমস্যার কারণে একত্রিত হয়ে পড়ে।
পূজা উদযাপন পরিষদ জানায় , মহালয়াতেই দেবী আগমনের ঘণ্টা বাজে আর বিজয়া দশমী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন। এই দিনটি শেষ হয় মহা-আরতির মাধ্যমে।
এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) ও রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুই দিন মহাসপ্তমী, সোমবার (১৯ অক্টোবর) অষ্টমী, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মহানবমী এবং বুধবার (২১ অক্টোবর) দশমীর মাধ্যমে বিদায় নেবেন দুর্গা দেবী। এবার দেবী বিদায় নেবেন নৌকায়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, দেবী বিসর্জন বিকেল ৩টায় রাজধানীসহ সারা দেশে বিজয়ের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এ উৎসব।
ষষ্ঠী পূজায় বিল্ব বৃক্ষের নিচে মাকে ষষ্ঠাধী কল্পারম্ভ, ষষ্ঠীবিহিত পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে মা-কে মন্দিরের আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয়। পরদিন বিল্ব বৃক্ষের নিচে মাকে স্নান করে মন্দিরে স্থাপন করা হবে। ষষ্ঠী পূজা সম্পন্নের মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হয় বলে জানিয়েছেন পুরোহিতরা।
বোধনের পর সাধারণত খুলে দেওয়া হয় মণ্ডপ। এর মাধ্যমে দেবী জেগে উঠেন আর তাতে দর্শন করা যায় দেবীর। শাস্ত্রমতে মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে (ষোল উপাদানে) দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। একই সঙ্গে দেবীকে আসন,বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। এ সময় পূজারীরা মায়ের সামনে বসে মায়ের মুখ দর্শন করবেন।
অষ্টমীতে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা হবে। এদিন রামকৃষ্ণ মিশন মন্দিরে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবী জ্ঞানে পূজা করেন ভক্তরা। অষ্টমীর দিন বিশেষ আকর্ষণ থাকে কুমারী পূজা এবং সন্ধিপূজায়।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রীরাম কৃষ্ণের কথামতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য।
শাস্ত্রমতে, এক বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজ্বিকা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চোদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়।
নির্বাচিত কুমারীকে মহাষ্টমীর দিন ভোরে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তাকে সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। কুমারীকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপাচারে (ষোলো উপাদান) দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারদিকে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি আর দেবী স্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
নবমীতে মণ্ডপে ভেসে আসে বিষাদের সুর। কারন দেবী দুর্গার বিদায়ের ঘণ্টা বাজে নবমীতে। এই দিনে আনন্দের মাঝে বিষাদের ছায়াও পড়ে দেবী ভক্তদের মনে। কারণ দেবী দুর্গা দশমীর দিন কৈলাসে ফিরে যাবেন। দশমীর দিন করা হবে প্রতিমা বিসর্জন, অশ্রুশিক্ত চোখে ভক্তরা বিদায় দেবেন দেবী দুর্গাকে।
সনাতন ধর্মমতে, নবমীর পুণ্য তিথিতে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে বিশ্বে শুভ শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন দেবী দুর্গা। নবমী তিথি শুরু হয় সন্ধিপূজা দিয়ে। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট সর্বমোট ৪৮ মিনিটে সন্ধিপূজা হয়। মূলত দেবী চামুণ্ডার পূজা করা হয় এসময়। এ সময়েই দেবী দুর্গার হাতে বধ হয়েছিল মহিষাসুর, আর রাম বধ করেছিলেন রাবণকে। এই দিনই দুর্গাপূজার অন্তিম দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ পরের দিন কেবল বিসর্জনের পর্ব। নবমীর রাতে উৎসবের রাত শেষ হয়। নবমী রাতে তাই মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায়ের ঘণ্টা বাজে।
বিজয়া দশমীর দিন মঙ্গলবার বিকাল ৩টার পর থেকে প্রতিমা বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে পলাশীর মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়ে সদরঘাটের ওয়াইজ ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন হবে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার এ বছর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সাথে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর ঢাকা মহানগরে ২৬১টি পূজার আয়োজন হয়েছিল। সে হিসেবে মহানগরে তিনটি পূজা মণ্ডপ কমেছে। এছাড়া সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১টি পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রতিমার পাশাপাশি ঘটে আয়োজিত পূজাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।






Leave a Reply