কুষ্টিয়া জেলার ২৫৮টি পূজা মণ্ডপে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

সজীব নন্দী (কুষ্টিয়া ) : কুষ্টিয়া জেলায় ২৫৮টি পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী আজ। কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া হরিবাসর সার্বজনীন পূজা মন্দির কমিটি ও নব যুবক সংঘ, আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব । অশুভ শক্তিকে শোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে হিন্দুসম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা।


গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ) ছিল মহাষষ্ঠী। এদিন দেবী দুর্গা শক্তি নিয়ে ভক্তদের কাছে পৌঁছান। গতকাল শুক্রবার ৮টায় বোধনের পর খুলে দেওয়া হয় মণ্ডপ। এর মাধ্যমে দেবী জেগে ওঠেন। আর তাতে দর্শন করা যায় দেবীর। শুক্রবার সকাল থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে চলেছে দেবীকে জাগানোর জন্য পূজা অর্পণ। পুরোহিতরা জানান, এর মধ্যে দিয়েই দুর্গাপূজা শুরু হয়।
 
১৭ ও ১৮ অক্টোবর শনিবার ও রোববার মহাসপ্তমী এবং নবপত্রিকা বা কলাবউ পূজা অনুষ্ঠিত হবে,শাস্ত্রমতে মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে (ষোল উপাদানে) দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। একই সঙ্গে দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। এ সময় পূজারীরা প্রতিমার সামনে বসে মায়ের মুখ দর্শন করবেন।

কুষ্টিয়া জেলার মন্দিরসহ সব মন্দিরেই সকাল থেকে শুরু হবে সপ্তমী পূজার আনুষ্ঠানিকতা। মহাসপ্তমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে সকাল  ১২টা ৫৬ মিনিট ৪৮ সেকেন্ট পর্যন্ত মহাসপ্তমী। এছাড়াও দিনব্যাপী চণ্ডী ও মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে পূজা, দেবী-দর্শন, দেবীর পায়ে ভক্তদের অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা চলবে বলে জানান সর্বজনীন পূজা আয়োজকরা ।

জানা গেছে, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার সূচি অনুযায়ী ১০ অক্টোবর শনিবার মহালয়া। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনী বার্তা ও তর্পণের মাধ্যমে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠী। এদিন বোধন ও অধিবাসের মাধ্যমে দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর শনিবার ও রোববার মহাসপ্তমী এবং নবপত্রিকা বা কলাবউ পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ১৯ অক্টোবর সোমবার মহাষ্টমী। এদিন কুমারী পূজা, সন্ধিপূজা ও অঞ্জলি অনুষ্ঠিত হবে। ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার মহানবমীতে নবমী যজ্ঞ, হোম-যজ্ঞ, আরতি, ধুনুচি নাচ ও ভোগ নিবেদনের আয়োজন থাকবে। ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী। এদিন দর্পণ বিসর্জন, সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে।

দুর্গাপূজা মূলত দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধ এবং অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। এ কারণে তাকে ‘মহিষমর্দিনী’ বলা হয়। আবার পুরাণে ‘দুর্গম’ নামের এক অসুরকে বধ করার কারণে তার নাম দুর্গা হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।অসুরবধের এই কাহিনি অন্যায়, অশুভ ও অসৎ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায়, শুভ ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, মহিষাসুরের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধ চলে নয় দিন ও নয় রাত। দশম দিনে বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেন।সন্ধ্যায় আরাত্রিকের পর প্রতিমা বিসর্জন ও শান্তিজল গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসবের।

 বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য মতে, সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে।
 
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,এ বছর কুষ্টিয়ার ছয় উপজেলায় কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ৭৯টি, ভেড়ামারা উপজেলায় ১১টি, মিরপুর উপজেলায় ৩১টি, কুমারখালী উপজেলায় ৬১টি, খোকসা উপজেলায় ৬১টি এবং দৌলতপুর উপজেলায় ১৫টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
 
কুষ্টিয়া হরিবাসর মন্দিরের পূরোহিত রতন চক্রবর্তী বলেন,গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। মা দুর্গা সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবেন। আমরা পূজার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। তিথিতে এবার সপ্তমী দুইদিন পালিত হবে সোমবার (১৯ অক্টোবর) বোধন পূজার মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুরু হবে। ১৬ অক্টোবর ২০২৬ মহাষষ্ঠী, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ মহাসপ্তমী, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর ২০২৬ মহানবমী, ২১ অক্টোবর ২০২৬ প্রতিমা বিসর্জন। শাস্ত্র অনুযায়ী এবার দেবীর আগমন ঘোড়ায় ও দেবীর গমন নৌকায়। প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শারদীয় দুর্গাপূজার পরিসমাপ্তি ঘটবে।
 
কুষ্টিয়া মহাশ্মশান মন্দিরের পুরোহিত পলাশ চক্রবর্ত্তী বলেন, গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) মহাষষ্ঠী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর শনিবার ও রোববার মহাসপ্তমী ১৯ অক্টোবর ২০২৬ মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর ২০২৬ মহানবমী, ২১ অক্টোবর ২০২৬ প্রতিমা বিসর্জন। এবার দেবীর আগমন ঘোড়ায় ও দেবীর গমন নৌকায়। প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শারদীয় দুর্গাপূজার পরিসমাপ্তি ঘটবে।

 কুষ্টিয়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. জয়দেব বিশ্বাস বলেন, এবার জেলায় ২৫৮টি পূজা মন্দিরে সরকারের সকল নির্দেশনা মোতাবেক পূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রশাসনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক রাখার ব্যবস্থা হয়েছে।এবার দেবীর আগমন হবে ঘোড়ায় এবং গমন হবে নৌকায়। ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গোৎসবে কুষ্টিয়া জেলায় মোট ২৫৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুষ্টিয়া পৌর শাখার সাধারণ সম্পাদক, দেবোওম বিশ্বাস বলেন, সবার সহযোগিতায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। শারদীয় দুর্গাপূজা সম্প্রীতি ও আনন্দের বার্তা নিয়ে আসবে এমনটাই প্রত্যাশা।
 
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো: আমিনুল ইসলাম জানান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভাতৃত্ববোধ বজায় রেখে সরকারি সকল নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব উদযাপন করতে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ করা হয়েছে।মণ্ডপে আনসার বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ মোতায়েন থাকবে। সেইসঙ্গে টহল টিমও কাজ করবে। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
 
এছাড়া পূজা মন্দিরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্যদের পূজামন্দিরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবক ও গার্ড নিয়োগ এবং পূজা মন্দিরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজা মন্দিরে পালাক্রমে ডিউটির ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বিট অফিসার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সুপারকে অবহিত করার জন্য সকলকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রতিটি পূজা মন্দিরে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পূজা মন্দিরে র‌্যাব, পুলিশ ছাড়া আনসার মোতায়েন করা হয়েছে।
 
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান জানান, যার যার ধর্মীয় উৎসব স্বাধীনভাবে ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা তাদের অধিকার। কোনো প্রোপাগান্ডা ও গুজবে কান দেওয়া যাবে না। বর্তমান সরকার মবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। মব সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
সনাতনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মা দুর্গা স্বর্গে কৈলাশ পর্বত হতে ঘোড়ায় চড়ে গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) মহাষষ্ঠী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর শনিবার ও রোববার মহাসপ্তমী ১৯ অক্টোবর ২০২৬ মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর ২০২৬ মহানবমী, ২১ অক্টোবর ২০২৬ প্রতিমা বিসর্জন। আর পঞ্জিকামতে ২১ অক্টোবর বিজয়ী মহা দশমী ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব সমাপ্ত হবে এবং মা দুর্গা তার ভক্তদের কাঁদিয়ে নৌকায় চড়ে স্বর্গে কৈলাশ পর্বতে গমন করবেন।২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী। এদিন দর্পণ বিসর্জন, সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে।

Alhamdulillah...