শারদীয় দুর্গোৎসবের আজ মহা সপ্তমী

নিজস্ব প্রতিবেদক :  শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিথি মহাসপ্তমী আজ। দেবীপক্ষের আবাহনে উৎসবের আবহে মুখরিত হয়ে উঠেছে পূজামণ্ডপগুলো। মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে আজ রয়েছে নবপত্রিকা প্রবেশ, নবপত্রিকার স্নান ও স্থাপন, মহাস্নান এবং সপ্তমীবিহিত পূজা। মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের বাদ্যে দেবী দুর্গার আরাধনায় মেতে উঠবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।


আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) মহাসপ্তমী। এ বছর তিথিচক্রে সপ্তমী তিথি থাকবে আগামীদিনও। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শারদীয় দুর্গোৎসবের এই তিথিতে দেবী দুর্গার শক্তি, কল্যাণ ও অশুভ শক্তির বিনাশের আরাধনার এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ভক্তরা দেবীর কাছে পরিবার, সমাজ ও দেশবাসীর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মঙ্গল কামনা করবেন।


আজ মহাসপ্তমীর প্রথম দিনের প্রভাতে শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে নবপত্রিকা স্নান ও পূজামণ্ডপে প্রবেশের মধ্য দিয়ে দিনের প্রধান আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকা ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। কলাগাছ, কচুগাছ, হলুদগাছ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ এই নয়টি উদ্ভিদ একত্র করে নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে স্নান করিয়ে নবপত্রিকাকে পূজামণ্ডপে নির্দিষ্ট স্থানে আজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। নবপত্রিকা পূজার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও উদ্ভিদজগতের সঙ্গে দেবী আরাধনার এক গভীর যোগসূত্র প্রতিফলিত হয়।


পূজাবিধি অনুসারে বিভিন্ন পবিত্র জল ও উপকরণ ব্যবহার করে দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিমার উদ্দেশ্যে এই স্নান সম্পন্ন করা হয়। পরে নির্দিষ্ট মন্ত্র ও পূজাবিধির মাধ্যমে দেবীর ঐশ্বরিক উপস্থিতি আহ্বানের আচার পালিত হয়, যা প্রাণপ্রতিষ্ঠা নামে পরিচিত। 


সপ্তমীবিহিত পূজায় দেবী দুর্গাকে ষোড়শোপচারসহ প্রচলিত শাস্ত্রীয় বিধিতে পূজা করা হয়। মন্ত্রপাঠ, পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, ভোগ নিবেদন ও আরতির মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবীর চরণে নিজেদের ভক্তি ও প্রার্থনা নিবেদন করবেন আজ। সকালে পূজা শেষে ভক্তরা ফুল ও বেলপাতা দিয়ে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করবেন। দেবীর আশীর্বাদ কামনায় পূজামণ্ডপে সমবেত হবেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী ভক্ত ও দর্শনার্থী।


দিনভর পূজামণ্ডপে মণ্ডপে ভক্ত-দর্শনার্থীদের পদচারণায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়বে। বিভিন্ন মণ্ডপে পূজা-অর্চনা, প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হবে মহাসপ্তমী। সন্ধ্যায় ধূপ, প্রদীপ ও অন্যান্য পূজাসামগ্রী দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে সন্ধ্যারতি। ঘণ্টা, শঙ্খ ও ঢাকের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে মণ্ডপের পরিবেশ।
পঞ্জিকায় উল্লেখিত নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, সপ্তমীবিহিত পূজার নির্ধারিত সময় সকাল ৭টা ৩১ মিনিট থেকে ৯টা ৫৭ মিনিট পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পূজাবিধি সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। তবে এ বছর সপ্তমী তিথি থাকবে আগামীকাল পর্যন্ত। যে কারণে আগামীকালও সপ্তমী পূজা হবে প্রতিটি মণ্ডপে। 

এই নির্ঘণ্ট মেনে দেশের পূজা মণ্ডপগুলোতে চলছে দেবী দুর্গাকে বরণের প্রস্তুতি। এ বছর ঢাকায় ২৫৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে এবং সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। আলোকসজ্জায় রঙিন হয়ে উঠেছে রাজধানী।

দুর্গাপূজা ঘিরে থাকছে নি-িদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা : শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা দেশে ৩৩ হাজার ৯৭টি পূজামণ্ডপে ২ লাখ ১২ হাজার ১১৪ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপ এলাকায় বাড়তি নজরদারির পাশাপাশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও ভিডিপি, কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে নি-িদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

সীমান্তের ৮ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা প্রায় ১ হাজার ৮০০ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা দেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ লক্ষ্যে সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে ১৮টি বেসক্যাম্প স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক ২৪ ঘণ্টা নজরদারি ও যোগাযোগের জন্য বিজিবি সদর দপ্তরে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।

অন্যদিকে পূজার নিরাপত্তায় দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ৩ হাজার ৪০০ সদস্য মোতায়েন করবে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, কোস্টগার্ড দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ঢাকা জোন ৩৭টি, পূর্ব জোন (চট্টগ্রাম) ৬৩টি, পশ্চিম জোন (মোংলা) ১৪৪টি ও দক্ষিণ জোন (ভোলা) ৩৭১টিসহ সর্বমোট ৬১৫টি মন্দির ও পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে। এসব ম পে টহল কার্যক্রম বৃদ্ধিসহ স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসন, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজা উদ্যাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নি-িদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে, বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের শেষ হবে। আবার এক বছরের জন্য ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসের দেবালয়ে। হিন্দু আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা—এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিনে মহাষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে দশমী, অর্থাৎ বিজয়া দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা থাকে পাঁচ দিন। তবে এবার মহাসপ্তমী তিথি শনি ও রোববার দুই দিন বিস্তৃত হওয়ার এবারের এই আনন্দোৎসব চলবে ছয় দিন। ষষ্ঠীর দিন শুক্রবার ষোড়শ উপচারে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আবাহন জানানো হয়। ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে শুরু হলো মূল আচার।

শনিবার সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের পর শুরু হবে সপ্তমীর পূজা; রোববার সপ্তমীতে বিহিত অধিক পূজা। সোমবার অষ্টমীতে হবে সন্ধিপূজা। মঙ্গলবার বিহিত পূজার মাধ্যমে হবে নবমী পূজা। আর বুধবার দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

দুর্গোৎসব চলাকালে রোজই অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগ-আরতির আয়োজন থাকবে। এ ছাড়া দেশজুড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে আলোকসজ্জা, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, নাটক, নৃত্যনাট্যসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হবে।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে পৃথক বাণীতে প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, দশভূজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি শরতে কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে মর্ত্যলোকে আসেন। সন্তানদের নিয়ে পক্ষকাল পিতার গৃহে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে।

Alhamdulillah...