নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাষ্টমী পালিত হবে। এবার তিথি স্থায়ী হওয়ায় শনিবার এবং গতকাল দুদিনব্যাপী মহাসপ্তমী পালিত হয়েছে। কুমারী পূজা, সন্ধি পূজা এবং অষ্টমী পূজার মধ্য দিয়ে পালিত হবে মহাষ্টমী। পঞ্জিকা অনুযায়ী, আজ ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে অষ্টমী পূজা শুরু হবে। কুমারী পূজা শুরু হবে সকাল ৯টা ৩০ এ।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর ঢাকের বাদ্যে মুখরিত আবহাওয়ায় সারা দেশে উদযাপিত হতে যাচ্ছে ছয় দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গাপূজার অতি পবিত্র তিথি ‘মহাঅষ্টমী’। মহাসপ্তমীর ভক্তিময় আয়োজন শেষে সোমবার দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপ সেজে উঠবে আরাধনা ও চণ্ডীপাঠের আবহে।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের সময়সূচি অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটের মধ্যেই শেষ হবে মহাঅষ্টমীর মূল বিহিত পূজা। এর পরপরই সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৮টা ৪৩ মিনিটের মধ্যে আয়োজিত হবে পরম পবিত্র ‘সন্ধিপূজা’।
অষ্টমীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘কুমারী পূজা’। পরম পবিত্র হৃদয়ের কোনো বয়ঃসন্ধি-পূর্ব এক থেকে ষোল বছর বয়সী অবিবাহিত বালিকাকে দেবী দুর্গার জীবন্ত রূপ হিসেবে কল্পনা করে চরণে জল, পুষ্প, নতুন বস্ত্র ও স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কার নিবেদনের মাধ্যমে আরাধনা করা হয়। রাজধানী ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় মহাসমারোহে এই কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে বাংলা পঞ্জিকার বিশেষ গণনা অনুযায়ী শনি ও রোববার দুদিন ধরে চলা মহাসপ্তমী তিথিতে দেবীর চক্ষুদানের মাধ্যমে প্রাণ প্রতিষ্ঠা, দর্পণ স্নান এবং ‘কলা বউ’ বা নবপত্রিকা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর চরণে ভক্তদের প্রথম অঞ্জলি নিবেদন এবং জগজ্জননীর কাছে সর্বজনীন কল্যাণ প্রার্থনায় ভক্তির এক অপূর্ব আবহ তৈরি হয়।
গত শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে সূচনা হওয়া এই দুর্গোৎসব আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে। এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটছে ঘোড়ায় চড়ে এবং মর্ত্যলোক থেকে স্বর্গলোকে গমন করবেন নৌকায়। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ১,৫০০টি বেড়ে সর্বমোট ৩৩,৮৫িটি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অষ্টমী ও নবমী তিথির মাহেন্দ্রক্ষণে অনুষ্ঠিত এই সন্ধিপূজা হিন্দু পুরাণের ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন দেবী দুর্গা অসুর চণ্ড ও মুণ্ডকে বিনাশ করতে পরম রূপী ‘চামুণ্ডা’ অবতার গ্রহণ করেছিলেন।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এই আচারটি সেই মুহূর্তটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন দেবী দুর্গা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুরকে বধ করার জন্য চামুণ্ডা রূপ ধারণ করেছিলেন।
ঐতিহ্য মেনে বিভিন্ন মন্দিরে অনুষ্ঠিত হবে কুমারী পূজা যেখানে দেবী দুর্গাকে ‘কুমারী’ বা পবিত্র হৃদয়ের এক কুমারী বালিকার রূপে পূজা করা হয়। রাজধানীতে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
এই আচারের সময় সাধারণত এক থেকে ১৬ বছর বয়সী, বয়ঃসন্ধি-পূর্ব এক অবিবাহিত বালিকাকে দেবী দুর্গা তথা দিব্য নারীশক্তির জীবন্ত রূপ হিসেবে পূজা করা হয়। এ সময় ভক্তরা কুমারীর চরণে জল, বস্ত্র, ফুল এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য অলঙ্কার নিবেদন করেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আজ রোববারও ছিল মহাসপ্তমী। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বছর শনি ও রোববার এই দুই দিন জুড়ে ‘মহা সপ্তমী’ তিথি থাকায় এ বছর দুইদিনব্যাপী মহা সপ্তমী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাজধানীসহ সারাদেশে হিন্দু-ধর্মাবলম্বীরা পূজামণ্ডপগুলোতে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় পূজা-অর্চণার মাধ্যমে দুইদিন ব্যাপী মহাসপ্তমী উদযাপন করে। দূর্গাভক্তরা দেবীর আরাধনায় পূজামণ্ডপগুলোতে দিনভর ভিড় জমায়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ি, গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১ তে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আগমন করবেন। অন্যদিকে, দেবী নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে গমন করবেন।
এ সময় দুর্গা প্রতিমার সামনে কুমারী দেবীর বেদি স্থাপন করা হয়। পূজার শুরুতেই মন্ত্রপাঠ ও প্রার্থনা করা হয়। পরে পঞ্চ উপকরণে কুমারী দেবীকে আরাধনা করেন পুরোহিত ও ভক্তরা। দুর্গা পূজার অন্যতম আকর্ষণ পূজা। দেবী পুরাণে কুমারীপূজার উল্লেখ রয়েছে। শাস্ত্র অনুসারে, ১ থেকে ১৬ বছর বয়সের অজাত পুষ্প সুলক্ষণা কুমারীকে পূজার উল্লেখ রয়েছে। ব্রাহ্মণ অবিবাহিত কন্যা কিংবা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কন্যাকেও পূজা করার বিধান রয়েছে। কুমারী পূজা শেষে সন্ধি পূজা এবং প্রসাদ বিতরণ করা হবে বিভিন্ন মন্ডপে। আগামীকাল (মঙ্গলবার) ভোর ৫টা ৩০ এ অনুষ্ঠিত হবে নবমী পূজা। বুধবার দশমী পূজা এবং দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব।
নিরাপত্তার স্বার্থে সারা দেশের মণ্ডপগুলোতে আনসার, পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি সেচ্ছাসেবকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও কড়া নিরাপত্তার চাদরে পুরো দেশ এখন শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দে ভাসছে।





Leave a Reply