কুষ্টিয়ার আমলা ,সাঁতারের বাতি ঘর

স্টাফ রিপোর্টার : কুষ্টিয়া শহর থেকে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়ক ধরে ২২ কিলোমিটার গেলেই মিরপুর উপজেলার আমলা গ্রাম। তবে এ অঞ্চলের মানুষ আমলাকে‘সাঁতার গ্রাম’নামেই বেশি চেনে। কারণ দেশের যে প্রান্তেই সাঁতার প্রতিযোগিতা হোক না কেন কোননা কোন সংগঠনের হয়ে অংশ নেন এই গ্রামের ছেলে মেয়েরা। আমলা সরকারী কলেজের হাজামজা পুকুরে অনুশীলন করেই তারা সুনাম কুড়োচ্ছেন সাঁতারে।
এ বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্ত:জেলা বয়স ভিত্তিক মহিলা সাঁতার প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ ৮টি স্বর্ণ পদক পেয়ে দেশ সেরা হয়েছে আমলার মেয়েরো।
সবুরা খাতুন, মমতাজ শিরিন ও লাভলী খাতুন। তিন জনের বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলায়। দরিদ্র পরিবারের বেড়ে ওঠা এই তিন কন্যা এখন দেশের সেরা তিন সাতারু। কেবল এরাই নয় আমলার বাড়ি এমন অর্ধশত তরুন-তরুনী দেশের সেরা সাতারুদের তালিকায় নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছেন। কুষ্টিয়ার এই আমলায় সাঁতারের গোড়া পত্তন হয় প্রায় তিন যুগ আগে। ১৯৮১ সালে প্রথম সুইমিং ক্লাব গড়ে উঠে এখানে। বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারশনের বর্তমান কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক আমিরুল ইসলাম প্রথম সুইমিং ক্লাব গড়ে তোলেন এই অজপাড়া গাঁয়ে। পরে ক্লাবের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে আমলায় একাধিক সুইমিং ক্লাব রয়েছে। এর মধ্যে আমলা সুইমিং ক্লাব, সাগরখালী সুইমিং ক্লাব, গড়াই সুইমিং ক্লাব, পপুলার সুইমিং ক্লাব ও সেন্টমার্টিন সুইমিং ক্লাব নামে ৫টি সংগঠনের ব্যানারে সাঁতার শিখছে বিভিন্ন বয়সের সাঁতারু। আমলার একাধিক সাঁতার সংগঠন জানান, সবুরা, মমতাজ ও লাভলীই নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাঁতারে গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখা রুবেল রানা ও লাবনী আক্তার জুঁই সহ আরো অনেক খ্যাতিমান সাঁতারুর জন্ম এ মাটিতে। এ কারণে আমলা সাঁতারুদের সূতিকাগার হিসেবে দেশ ব্যাপি পরিচিতি লাভ করেছে।
১৯৯০ সালের পর থেকে এখানকার সাঁতারুরা বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি এবং বিজেএমসির পক্ষে জাতীয় পর্যায়ে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করে দেশের সাঁতার বোদ্ধাদের নজর কাড়তে সক্ষম হন। কয়েক বছর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কেয়া কসমেটিকস জাতীয় বয়স ভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমলার সাঁতারুদের উপর নির্ভর করেই বিজেএমসি ও বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি সাঁতার দল পদক তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এখানকার সাঁতারুদের অবদান কম নয়। সাফ গেমস-এ আমলার সাঁতারু রুবেল রানা স্বর্ণ পদক পান। ২০০১ সালে ইরানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইসলামিক মহিলা সাঁতারে সবুরা স্বর্ণ পদক এবং মমতাজ শিরিন রৌপ্য পদক জিতে নেন। সর্বশেষ গত বছর বয়স ভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমলার খুদে সাতারুরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়ে জিতে নেন অর্ধ শতাধিক স্বর্ণ পদক।
অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরনণ করে স্থানীয় সাঁতার ক্লাব গুলোর অধিনে শতাধিক শিশু-কিশোর এখানে সাঁতার অনুশীলন করে প্রায় সারা বছর ধরে।
তবে সাঁতারে যেমন সাফল্য আছে তেমনি নানা আছে নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা। বড় সমস্যা আর্থিক ও সুইমিং পুলের অভাব। আমলা সুইমিং পুলের সাধারণ সম্পাদক মাসুম-আল-মাজি বলেন, যে সব বাচ্চা ছেলে মেয়েরা সাঁতার শিখতে আসে তারা সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমার ক্লাবে সারা বছরই ৪০ থেকে ৫০ জনশিক্ষার্থী থাকে। যারা বিভিন্ন জেলার হয়ে সাঁতারে অংশ নেয়। আর্থিক সমস্যার কারণে ক্যাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া সুইমিংপুল না থাকায় সবাই পুকুরে সাঁতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। মাজি আরো বলেন, আমলার সাতারুরা সারা দেশের বিভিন্ন ক্লাব ও বাহিনীতে সুনামের সঙ্গে খেলছে। দেশ ও দেশের বাইরে থেকে আমলার ছেলে-মেয়েরাই পদক ছিনিয়ে আনছে। কোন প্রতিযোগিতায় যদি ১০০ পদক থাকেতার ৮০ ভাগ পদক আমলার সাঁতারুদের দখলে থাকে।
সাতারুদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, সুইমিংপুল সাঁতার শেখার জন্য বড় বাধা। সুইমিংপুল না থাকায় আমলা সরকারি ডিগ্রী কলেজের কয়েকটি পুকুরই তাদের বড় ভরসা। বর্ষার সময় সাঁতার শেখা সমস্যা নাহলে শীত কালে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সাঁতার প্রশিক্ষনে সমস্যা দেখা দেয়।
সাঁতার কোচ মর্জিনা খাতুন জানান, সাঁতারে যাদের এতো অবদান তাদের প্রশিক্ষণ নিতে হয় একটি ছোট্ট পুকুরে। দীর্ঘ দিন থেকে এখানে একটি সুইমিংপুল স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসলে ও সম্প্রতি কুষ্টিয়া শহরে একটি আধুনিক মানের করেছে সরকার। তবে আমলার ক্লাব গুলোর আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় ২২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারছে না।
স্থানীয় সংগঠনক রাজানান, আমলার বেশি ভাগ সাতারু আনসারের হয়ে লড়ে থাকেন। তাই আমলায় একটি সুইমিংপুল গড়ে তোলার আগ্রহ দেখান আনসার ও ভিডিপি মহা পরিচালক। সুইমিংপুল নির্মানের জন্য কয়েক বছর আগে আমলায় হাইস্কুলের নিকট থেকে দুই বিঘা জমি নাম মাত্র মুল্যে কেনা হয়। জমি কেনা হলে ও সুইমিংপুল বাস্তবায়নে আর কোন অগ্রগতি হয়নি।
বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারশনের যুগ্ম সম্পাদক আমিরুল ইসলাম জানান, সাঁতারে যেমন সমস্যা রয়েছে তেমনি সম্ভাবনা রয়েছে। দারিদ্রতা ও আর্থিক সমস্যা থাকা সত্বে ও আমলার সাতারুরা পিছিয়ে নেই। তারা প্রতি বছর দেশ ও দেশের বাইরে অবদান রেখে চলেছে। তবে সাঁতারু দের সমস্যার সমাধান আগ্রহ হারাবে ছেলে মেয়েরা।
এদিকে আমলার পাশাপাশি কুষ্টিয়া পৌরসভার উধ্যোগে তাদের নিজস্ব সুইমিংপুলে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষন শুরু হয়েছে। গত তিন বছর ধরে ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে পৌর মেয়র আনোয়ার আলী নিজের উদ্যোগে এ ক্যাম্প চালু করেছে। প্রথম বছর শতাধিক শিশু প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এই ক্যাম্প থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.